সুরা আবাসার ফযিলত ও আমল
সুরা আল আরাফ এর ফযিলত
সূরা আল আরাফ (আরবি ভাষায়: سورة الأعراف, "অর্থ উঁচু স্থান")। এর আয়াত সংখ্যা ২০৬টি। এর রূকুর সংখ্যা ২৪টি। কুরআনের সপ্তম সূরা। এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটি হলো মাক্কী সুরা। এই সূরার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হচ্ছে রিসালাতের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত।
আল্লাহ প্রেরিত রাসূলের আনুগত্য করার জন্যে শ্রোতাদের উদ্বদ্ধ করাই এর সমগ্র আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। কিন্তু এ দাওয়াত সতর্ক করার ও ভয় দেখানোর ভাবধারাই ফূটে উঠেছে বেশী করে।কারণ এখানে যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে (অর্থাৎ মক্কাবাসী) তাদেরকেেএটা বুঝাতেযে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের স্থুল শ্রবণ ও অনুধাবন শক্তি, হঠকারিতা, গোয়ার্তুমী ও একগুঁয়ে মনোভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। যার ফলে রসূলের প্রতি তাদেরকে সম্বোধন করা বন্ধ করে দিয়ে অন্যদেরকে সম্বোধন করার হুকুম অচিরেই নাযিল হতে যাচ্ছিল। তাই বুঝাবার ভংগীতে নবুওয়াত ও রিসালাতের দাওয়াত পেশ করার সাথে সাথে তাদেরকে এ কথাও জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, নবীর মোকাবিলায় তোমরা যে কর্মনীতি অবলম্বন করেছো তোমাদের আগের বিভিন্ন মানব সম্প্রদায়ও নিজেদের নবীদের সাথে অনুরূপ আচরণ অবলম্বন করে অত্যন্ত মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হয়েছিল।
সুরা আন-নিসা এর ফযিলত
এই সুরার বিষয়বস্তুঃ
এ সূরাটি কয়েকটি ভাষণের সমষ্টি । সম্ভবত তৃতীয় হিজরীর শেষের দিক থেকে নিয়ে চতুর্থ হিজরীর শেষের দিকে অথবা পঞ্চম হিজরীর প্রথম দিকের সময়-কালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এর বিভিন্ন অংশ নাযিল হয়। যদিও নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না, কোন আয়াত থেকে কোন আয়াত পর্যন্ত একটি ভাষণের অন্তরভুক্ত হয়ে নাযিল হয়েছিল এবং তার নাযিলের সময়টা কি ছিল, তবুও কোন কোন বিধান ও ঘটনার দিকে কোথাও কোথাও এমন সব ইংগিত করা হয়েছে যার সহায়তায় রেওয়ায়াত থেকে আমরা তাদের নাযিলের তারিখ জানতে পারি। তাই এগুলোর সাহায্যে আমরা এসব বিধান ও ইংগিত সম্বলিত এ ভাষণগুলোর মোটামুটি একটা সীমা নির্দেশ করতে পারি।
যেমন আমরা জানি উত্তরাধিকার বন্টন ও এতিমদের অধিকার সম্বলিত বিধানসমূহ ওহোদ যুদ্ধের পর নাযিল হয়। তখন সত্তর জন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন। এ ঘটনাটির ফলে মদীনার ছোট জনবসতির বিভিন্ন গৃহে শহীদদের মীরাস কিভাবে বন্টন করা হবে এবং তারা যেসব এতিম ছেলেমেয়ে রেখে গেছেন তাদের স্বার্থ কিভাবে সংরক্ষণ করা হবে, এ প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। এরি ভিত্তিতে আমরা অনুমান করতে পারি, প্রথম চারটি রুকু, ও পঞ্চম রুকূর প্রথম তিনটি আয়াত এ সময় নাযিল হয়ে থাকবে।
যাতুর রিকা’র যুদ্ধে ভয়ের নামায (যুদ্ধ চলা অবস্থায় নামায পড়া) পড়ার রেওয়ায়াত আমরা হাদীসে পাই। এ যুদ্ধটি চতুর্থ হিজরীতে সংঘটিত হয়। তাই এখানে অনুমান করা যেতে পারে, যে ভাষণে (১৫ রুকূ) এ নামাযের নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে সেটি এরি কাছাকাছি সময়ে নাযিল হয়ে থাকবে।
চতুর্থ হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে মদীনা থেকে বনী নযীরকে বহিষ্কার করা হয়। তাই যে ভাষণটিতে ইহুদীদেরকে এ মর্মে সর্বশেষ সর্তকবাণী শুনিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, আমি তোমাদের চেহারা বিকৃত করে পেছন দিকে ফিরিয়ে দেবার আগে ঈমান আনো, সেটি এর পূর্বে কোন নিকটতম সময়ে নাযিল হয়েছিল বলে শক্তিশালী অনুমান করা যেতে পারে।
বনীল মুসতালিকের যুদ্ধের সময় পানি না পাওয়ার কারণে তায়াম্মুমের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আর এ যুদ্ধটি পঞ্চম হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিল। তাই যে ভাষণটিতে (৭ম রুকূ) তায়াম্মুমের কথা উল্লেখিত হয়েছিল সেটি এ সময়ই নাযিল হয়েছিল মনে করতে হবে।
এই সুরার ফযিলতঃ
সূরার ফযিলত সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে কেউ প্রথম সাতটি সূরা গ্রহণ করবে সে আলেম হিসেবে গণ্য হবে”। [মুসনাদে আহমাদ: ৬/৮৫, ৬/৯৬]
তাছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “যে সূরা আলে ইমরান পড়বে সে অমুখাপেক্ষী হবে, আর সূরা আন-নিসা হচ্ছে সৌন্দর্যপূর্ণ।” [সুনান দারেমীঃ ৩৩৯৫]
সূরার শুরুতে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অন্যের অধিকার সংক্রান্ত বিধান জারি করা হয়েছে। যেমন- অনাথ ইয়াতীমের অধিকার, আত্মীয়-স্বজনের অধিকার ও স্ত্রীদের অধিকার প্রভৃতির কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, হক্কুল-‘ইবাদ বা অন্যের অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কতকগুলো অধিকার রয়েছে, যেগুলো সাধারণতঃ দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় পড়ে এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তা কার্যকর করা যেতে পারে। সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া ও শ্রমের মজুরী প্রভৃতি এ জাতীয় অধিকার যা মূলতঃ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে কার্যকর হয়ে থাকে। এসব অধিকার যদি কোন এক পক্ষ আদায় করতে ব্যর্থ হয় অথবা সেক্ষেত্রে কোন প্রকার ক্রটি-বিচ্যুতি হয়, তাহলে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তার সুরাহা করা যেতে পারে। কিন্তু সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, কারো নিজ বংশের ইয়াতীম ছেলে-মেয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনের পারস্পারিক অধিকার আদায় হওয়া নির্ভর করে সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও আন্তরিকতার উপর। এসব অধিকার তুলাদণ্ডে পরিমাপ করা যায় না। কোন চুক্তির মাধ্যমেও তা নির্ধারণ করা দুষ্কর। সুতরাং এসব অধিকার আদায়ের জন্য আল্লাহ-ভীতি এবং আখেরাতের ভয় ছাড়া দ্বিতীয় আর কোন উত্তম উপায় নেই। আর একেই বলা হয়েছে ‘তাকওয়া’। বস্তুতঃ এই তাকওয়া দেশের প্রচলিত আইন ও প্রশাসনিক শক্তির চেয়ে অনেক বড়। তাই আলোচ্য সূরাটিও তাকওয়ার বিধান দিয়ে শুরু হয়েছে। সম্ভবতঃ এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের খোত্বায় এ আয়াতটি পাঠ করতেন। বিয়ের খোতবায় এ আয়াতটি পাঠ করা সুন্নাত। তাকওয়ার হুকুমের সাথে সাথে আল্লাহর অসংখ্য নামের মধ্যে এখানে ‘রব’ শব্দটি ব্যবহার করার মধ্যেও একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অর্থাৎ এমন এক সত্তার বিরুদ্ধাচারণ করা কি করে সম্ভব হতে পারে, যিনি সমগ্র সৃষ্টিলোকের লালন-পালনের যিম্মাদার এবং যাঁর রুবুবিয়্যাত বা পালন-নীতির দৃষ্টান্ত সৃষ্টির প্রতিটি স্তরে স্তরে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত।
এখানে দু’টি মত রয়েছে, (এক) তার থেকে অর্থাৎ তারই সমপর্যায়ের করে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। (দুই) তার শরীর থেকেই তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। এ মতের সপক্ষে হাদীসের কিছু উক্তি পাওয়া যায়, যাতে বুঝা যায় যে, মহিলাদেরকে বাকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। [দেখুন- বুখারীঃ ৩৩৩১, মুসলিমঃ ১৪৬৮]
বলা হয়েছে যে, যাঁর নাম উচ্চারণ করে তোমরা অন্যের থেকে অধিকার দাবী কর এবং যাঁর নামে শপথ করে অন্যের কাছ থেকে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করে থাক সে মহান সত্ত্বার তাকওয়া অবলম্বন কর। আরও বলা হয়েছে যে, আত্মীয়তার সম্পর্কে -তা পিতার দিক থেকেই হোক, অথবা মায়ের দিক থেকেই হোক -তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাক এবং তা আদায়ের যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন কর।
আলোচ্য আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থাৎ তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। সুতরাং তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখ। এ অর্থটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে। [তাবারী] আয়াতের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমরা যে আল্লাহ ও আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে পরস্পর কোন কিছু চেয়ে থাক। অর্থাৎ তোমরা সাধারণত বলে থাক যে, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে কোন কিছু তোমার কাছে চাই। সুতরাং দু’ কারণেই তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। এ অর্থটি মুজাহিদ থেকে বর্ণিত হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] পবিত্র কুরআনের আত্মীয়তার সম্পর্ক বুঝানোর জন্য ‘আরহাম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলতঃ একটি বহুবচনবোধক শব্দ। এর একবচন হচ্ছে ‘রাহেম’। যার অর্থ জরায়ু বা গর্ভাশয়। অর্থাৎ জন্মের প্রাক্কালে মায়ের উদরে যে স্থানে সন্তান অবস্থান করে। জন্মসূত্রেই মূলতঃ মানুষ পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বুনিয়াদকে ইসলামী পরিভাষায় ‘সেলায়ে-রাহ্মী’ বলা হয়। আর এতে কোন রকম বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হলে তাকে বলা হয় ‘কেত্বয়ে-রাহ্মী’। হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার রিযিকের প্রাচুর্য এবং দীর্ঘ জীবনের প্রত্যাশা করে, তার উচিত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। [বুখারীঃ ২০৬৭; মুসলিমঃ ২৫৫৭]
অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের প্রায় সাথে সাথেই আমিও তাঁর দরবারে গিয়ে হাজির হলাম। সর্বপ্রথম আমার কানে তার যে কথাটি প্রবেশ করল, তা হল এইঃ হে লোক সকল! তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বেশী বেশী সালাম দাও। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য মানুষকে খাদ্য দান কর। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোল এবং রাতের বেলায় সালাতে মনোনিবেশ কর, যখন সাধারণ লোকেরা নিদ্রামগ্ন থাকে। স্মরণ রেখো, এ কথাগুলো পালন করলে তোমরা পরম সুখ ও শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে’। [মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৫১; ইবন মাজাহ ৩২৫১]
অন্য হাদীসে এসেছে, ‘উম্মুল-মুমিনীন মায়মুনা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর এক বাঁদিকে মুক্ত করে দিলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যখন এ খবর পৌঁছালেন, তখন তিনি বললেন, তুমি যদি বাঁদিটি তোমার মামাকে দিয়ে দিতে, তাহলে অধিক পূণ্য লাভ করতে পারতে। [বুখারীঃ ২৫৯৪]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেনঃ ‘কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করলে সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু কোন নিকট আত্মীয়কে সাহায্য করলে একই সঙ্গে সদ্কা এবং আত্মীয়তার হক আদায়ের দ্বৈত পূণ্য লাভ করা যায়’। [বুখারীঃ ১৪৬৬, মুসলিমঃ ১০০০]
এখানে মানুষের অন্তরকে আত্মীয়-স্বজনের অধিকার আদায়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে খুবই সচেতন ও পর্যবেক্ষণকারী।’ আল্লাহ তোমাদের অন্তরের ইচ্ছার কথাও ভালভাবে অবগত রয়েছেন। কিন্তু যদি লোক লজ্জার ভয়ে অথবা সমাজ ও পরিবেশের চাপে পড়ে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সুব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর কাছে এর কোন মূল্য নেই।
সুরা আর-রহমানের ফযিলত
হযরত আলী (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক জিনিসের একটি সৌন্দর্য রয়েছে। আর কোরআনের সৌন্দর্য হলো সূরা,আর-রাহমান।(বাইহাকী- শুআবুল ঈমান)
সমগ্র কোরআনের মধ্যে এ সূরাটি অদ্বিতীয়।এর রচনা শৈলী ও বাক্য বিন্যাস
প্রণালী এত প্রাণস্পর্শী যে , আরবীয় কবিগণ সূরাটির ছন্দ মাধুর্য , ভাষার
দ্যোতনা , ভাব ও বক্তব্যের ব্যঞ্জনায় অভিভূত হয়ে এর ভূয়সী প্রশংসা করতেন
।
এ সূরা নিয়মিত পাঠ করলে পাঠকারীর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। তাঁর জন্য দোযখের দরজা সমূহ বন্ধ হয়ে যাবে এবং বেহেশতের দরজা সমূহ খুলে যাবে।
কবিগণের কোরাস ছন্দের ন্যায় এ সূরাটিতে "ফাবিআইয়্যি আ - লা - ই
রাব্বিকুমা তুকাযযিবান " বাক্যটি পুনঃ পুনঃ উল্লেখ থাকায় এটি অত্যন্ত
সুন্দর ও শ্রুতিমধুর হয়েছে । এই আয়াতে সুরা রহমানে ৩১ বার মহান আল্লাহ
বলেছেন। এর সুমধুর শব্দ ও অমিয় বাক্যলহরীর আবেগে কাফেররাও হতবাক হয়ে যেত !
একটি অজানা তথ্য জেনে নিন সূরা আর- রাহমান সম্পর্কে।
এ সূরা নিয়মিত পাঠ করলে কিয়ামতের দিন পাঠকের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল হবে এবং দুনিয়াতে তাঁর রুজি বৃদ্ধি পাবে।
একাধারে ৪০ দিন পর্যন্ত সূর্যোদয়ের সময় এ সূরা পাঠকালে “ফাবি আইয়্যি আ-লা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান” পড়ার সময় আঙ্গুল দিয়ে সূর্যের দিকে ইশারা করলে মানুষ সহ য কোন প্রাণী পাঠকের অনুগত হবে।
সমগ্র সূরায় এ বাক্য একত্রিশ বার ব্যবহৃত হয়েছে । প্রত্যেক বার বাক্যটি
নতুন নতুন বিষয়বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে এটা অলংকার শাস্ত্রের
পরিপন্থী নয়। আল্লামা সুয়ূতী এ ধরনের পুনরুল্লেখের নাম রেখেছেন।
হাদীস শরিফে নবী করীম ( সঃ ) এরশাদ করেন , প্রত্যেক জিনিসেরই একটা নিজস্ব
সৌন্দর্য আছে । সূরা আর-রহমান কোরআন শরীফের সৌন্দর্য । ফযীলতের দিক দিয়ে
এটি অর্ধেক কোরআনের সমান ।
কোনাে কোনাে বুযর্গ এ সূরাটিকে কোরআনের বন্ধু বলে উল্লেখ করেছেন ।
নবী করীম ( সাঃ ) এরশাদ করেন , যারা শুধু আল্লাহকে খুশী করার জন্য এ সূরাটি
প্রত্যহ আছরের নামায বাদ পাঠ করবে , তাদের চেহারা নূরানী হবে , স্ত্রী
পুত্র তার তাবেদার হবে , তার রিজিক বৃদ্ধি পাবে এবং সে ব্যক্তি বেহেশতের
হকদার হয়ে যাবে।
এক বর্ণনায় আছে ( ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান গনী জুন্নরাইন ( রাঃ ) এ সূরাটি পাঠ করে বেহেশতবাসীকে মােহিত করবেন। )
সূরা আররহমানের বেশির ভাগ বিষয়বস্তু মহান আল্লাহ তাআলার ইহলৌকিক ও
পারলৌকিক অনুগ্রহসমূহের বর্ণনা সম্পর্কিত । তাই যখন কোন আল্লাহর বিশেষ
অবদান উল্লেখ করা হয়েছে তখনই মানুষকে সতর্ক ও কৃতজ্ঞতা স্বীকারে উৎসাহিত
করার জন্যে "ফাবি আইয়ি আলা ইরাব্বিকুমা তুকায্যিবান" বাক্যটি বার বার
উল্লেখ করা হয়েছে ।
এটা বিশুদ্ধভাষী আরবদের গদ্য ও পদ্য রচনায় বহুল ব্যবহৃত এবং প্রশংসিত।
শুধু আরবী ভাষাই নয় , ফারসী , উর্দু , বাংলা প্রভৃতি ভাষায়ও
সর্বজনস্বীকৃত কবিদের কাব্যে এর উদাহরণ পাওয়া যায়।
তবে এসব উদাহরণ উদ্ধৃত করার স্থান এটা নয় । তারপরেও জানার জন্য বলা।
তাফসীরে রূহুল মা'আনীতে এস্থলে কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে ।
সূরা আররাহমান মক্কায় না মদীনায় অবতীর্ণ , এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে ।
কুরতুবী কতিপয় হাদীসের ভিত্তিতে মক্কায় অবতীর্ণ হওয়াকে অগ্রাধিকার
দিয়েছেন ।
তিরমিযীতে হযরত জাবের ( রাঃ ) বর্ণনা করেন , রাসূলুৱাহ ( সাঃ ) কয়েকজন
লােকের সামনে সমগ্র সূরা আররাহমান তেলাওয়াত করেন । তারা শুনে নিশ্চুপ
থাকলে রাসূলুল্লাহ ( সাঃ ) বললেন,
আমি ‘ লাইলাতুল জ্বিনে ’ জ্বিন — রজনীতে – জ্বিনদের সামনে এ সূরা তেলাওয়াত
করেছিলাম । প্রভাবান্বিত হওয়ার দিক দিয়ে তারা তােমাদের চেয়ে উত্তম ছিল ।
কারণ , আমি যখনই "ফাবি আইয়ি আলা ইরাব্বিকুমা তুকায্যিবান" আয়াতটি
তেলাওয়াত করতাম , তখনই তারা সমস্বরে বলে উঠত :
ربّنَا لا نكْذِبُ بِشى من نعمَتك فَلك الحمد,
অর্থ, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা আপনার কোনো অবদানই অস্বীকার করবনা। আপনার জন্যই সমস্ত প্রশাংসা।
এ হাদীস থেকে জানা যায় , সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ । কেননা , জ্বিন - রজনীর
ঘটনা মক্কায় সংঘটিত হয়েছিল। এ রজনীতে রাসূলুল্লাহ ( সাঃ ) জ্বিনদের কাছে
ইসলাম প্রচার করেছিলেন এবং তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা দান করেছিলেন।
আল্লাহ তায়ালার ৯৯ নাম ও ফযিলত
আল্লাহর ৯৯টি গুণ বাচক নাম এবং নামের অর্থ সহ ফজিলত ও
আমলের সময় ও নিয়ম সহকারে তুলেধরা হয়েছে।
বিভিন্ন হাদীস অণুসারে,
আল্লাহ’র ৯৯টি নামের একটি তালিকা আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট
ধারাবাহিক ক্রম নেই; তাই সম্মিলিত মতৈক্যের ভিত্তিতে কোনো সুনির্দিষ্ট
তালিকাও নেই। তাছাড়া কূরআন এবং হাদিসের বর্ণনা অণুসারে আল্লাহ্’র সর্বমোট
নামের সংখ্যা ৯৯-এর অধিক, প্রায় ৪,০০০। অধিকন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ
কর্তৃক বর্ণিত একটা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ্ তার কিছু নাম
মানবজাতির অজ্ঞাত রেখেছেন।
“ আল্লাহ বলে আহ্বান করো কিংবা রহমান বলে, যে নামেই আহবান করো না কেন, সব সুন্দর নাম তাঁরই। — সূরা বনী-ইসরাঈল আয়াত-১১০। ”
অনেকগুলো
হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহ’র নেকগুলো নাম-এর
উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিশুদ্ধ হাদিসে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)
জনাব মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উক্তি বর্ণনা করেন যে, “ আল্লাহ তাআলার ৯৯টি
নাম আছে; সেগুলোকে মুখস্থকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেহেতু আল্লাহ
তাআলা বিজোড় (অর্থাৎ, তিনি একক, এবং এক একটি বিজোড় সংখ্যা), তিনি বিজোড়
সংখ্যাকে ভালোবাসেন। আর ইবনে উমরের বর্ণনায় এসেছে যে, (শব্দগুলো হলো) “যে
ব্যক্তি সেগুলোকে পড়বে”।”কোরআনের বর্ণনায় আল্লাহ’র গুণবাচক নামসমূহকে “সুন্দরতম নামসমূহ” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছোট
ছোট কিছু দোয়া আমল করলে অনেক নেকি হাসিল করা যায় । আমরা এসব দোয়া গুলো
একটু সময় দিলেই আমল করতে পারি এবং অনেক নেকি হাসিল করতে পারি। দোয়া চাওয়া
বা দোয়া করা মুসলিম সম্প্রদায় এর জন্য খুব জরুরি | একটা বিষয় প্রত্যেক
মুসলমানকে আল্লাহর কাছে একান্ত কিছু চাইতে হলে দোয়া করতে হয় তবে এই দোয়া
চাওয়ার কিছু নিয়ম আছে প্রত্যেকটি চাওয়ার জন্য থাকে আলাদা দোয়া, আলাদা আমল
,কারণ এক এক দোয়ার এক এক রকম ফজিলত, আমরা অনেকে জানি না কোন সময় কোন দোয়া
পড়তে হয় অথবা কোন দোয়া পড়লে কি ফজিলত হয় তাও জানি। তাই আমরা হয় তো দোয়া করেও
আমাদের চাওয়াটা পাই না আবার এরুপ ও হাদিসে বর্ননা আছে যে আমরা আল্লালাহর
কাছে যা চাই তা আল্লাহ তার পরিবর্তে আমাদের সেই সমান কোন বিপদ থেকে মুক্তি
দেন বা যা চাই তা আখেরাতের জন্য বরাদ্দ করেন যাই হোক আল্লাহ তা'আলা সুমহান
তিনি পরম দয়ালু আল্লাহর দরবারে দু"হাত দিলে কোন কিছু চাইলে আল্লহ নারাজ করেন
না।
সুরা ইয়াছিন এর ফযিলত
কুরআনুল কারিম ৩০ পারায় সাজানো। ২২তম পারার শেষে এ সুরাটি শুরু হয়েছে ২৩ তম পারার প্রথম দিকে শেষ হয়েছে। সুরাটিতে আয়াত সংখ্যা ৮৩, পাঁচটি রুকু এবং ৭টি মুবিন রয়েছে। সুরাটি ফজিলত সম্পর্কে হাদিসের অনেক বর্ণনা রয়েছে।
হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক বস্তুরই একটা হৃদয় থাকে আর কোরআনের হৃদয় হলো সূরা ইয়াসিন। যে ব্যক্তি সূরা ইয়াসিন একবার পড়বে, মহান আল্লাহ তাকে দশবার পুরো কোরআন পড়ার সওয়াব দান করবেন।’ (তিরমিজি)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, ‘সূরা ইয়াসিন কোরআনের রূহ বা হৃৎপিণ্ড। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের কল্যাণ লাভের জন্য সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে তার জন্য রয়েছে মাগফিরাত বা ক্ষমা।
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সূরা ইয়াসিনকে কোরআনের হৃদয় এ কারণে বলা হয়েছে যে, ‘এ সূরায় কেয়ামত ও হাশর-নশর বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা ও অলঙ্কারসহকারে বর্ণিত হয়েছে। পরকালে বিশ্বাস ঈমানের এমন একটি মূলনীতি, যার ওপর মানুষের সব আমল ও আচরণের বিশুদ্ধতা নির্ভরশীল। পরকালের ভয়ভীতি মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং অবৈধ বাসনা ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে। তাই দেহের সুস্থতা যেমন অন্তরের সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল তেমনি ঈমানের সুস্থতা পরকালের চিন্তার ওপর নির্ভরশীল (রুহুলমায়ানি)।
সূরা ইয়াসিন বুঝে পড়ায় রয়েছে অনেক উপকারিতা। এ সূরায় মানুষকে পরকালের প্রস্তুতির দিকে আহ্বান করে। আর পরকালভীতিই মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং অবৈধ বাসনা ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে।
সুতরাং দেহের সুস্থতা যেমন অন্তরের সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল তেমনি ঈমানের সুস্থতা পরকালের চিন্তার ওপর নির্ভরশীল। এ সূরার নিয়মিত আমলকারীর প্রতি থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারীর কোনো গোনাহ থাকে না। সে দিক থেকে পরকালীন কল্যাণের জন্য সূরা ইয়াসিন বুঝে পড়া খুবই জরুরি।
তিরমিজী শরিফে উল্লেখ রয়েছে, সূরা ইয়াছিন একবার পাঠ করলে দশবার কোরআন খতম করার নেকী হয় এবং পাঠকের সব গুনাহ মাফ হয়। হাদিসে আরো বলা হয়েছে, রাতে সূরা ইয়াছিন পাঠ করলে নিস্পাপ অবস্থায় ঘুম থেকে উঠা যায় এবং পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। যে ব্যক্তি সূরা ইয়াছিন বেশি বেশি পড়ে থাকে কেয়ামতের দিন এই সূরাই তার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত সূরা ইয়াছিন পাঠ করবে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খোলা থাকবে।
হজরত আবু যর (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.) এর কাছ থেকে শুনেছি তিনি বলেছেন, মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তির কাছে সূরা ইয়াসিন পাঠ করলে তার মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হয়ে যায়। (মাজহারি)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি সূরা ইয়াসিন অভাব-অনটনের সময় পাঠ করে তাহলে তার অভাব দূর হয়, সংসারে শান্তি ও রিজিকে বরকত লাভ হয়। (মাজহারি)।
ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুখে-শান্তিতে থাকবে। যে সন্ধ্যায় পাঠ করবে সে সকাল পর্যন্ত শান্তিতে থাকবে (মাজহারি)। এছাড়াও সূরা ইয়াসিনের বহু ফজিলত হাদিসে বর্ণিত আছে, তাই আমাদের এই সূরাটি অর্থসহ বুঝে পড়া ও আমল করা উচিত।
গোনাহ মাফের মাধ্যম সুরা ইয়াসিন
প্রতিদিনের কাজ-কর্মে
মানুষ অনেক ভুল-ত্রুটি করে থাকে। আর এসব ভুল-ত্রুটি করা গোনাহের কাজ। গোনাহ
মানুষকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে। আর জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার
একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর অনুগ্রহ ও নেক আমল করা। হাদিসে এসেছে-
- হজরত
ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সুরা
ইয়াসিন তেলাওয়াত করবে আল্লাহ তাআলা তার বিগত জীবনের সব গোনাহ ক্ষমা করে
দেবেন।’ (বায়হাকি,আবু দাউদ)
- হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু
বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে
ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রাতে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করবে,
আল্লাহ তার ওই রাতের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন।’ (দারেমি)
অভাবমুক্ত থাকার আমল সুরা ইয়াসিন
মানুষের নানামুখী
অভাব-অনটন থাকে। শুধু পরিশ্রমে কোনো মানুষের অভাব শেষ হয় না। প্রয়োজন হয়
আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহের। সুরা ইয়াসিনের আমল অভাবি ব্যক্তির জন্য
আল্লাহর মহা অনুগ্রহ। এ সুরার আমলে দুনিয়ার প্রয়োজন পূর্ণ হয়ে যায়। হাদিসে
এসেছে-
- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যদি কোনো
ব্যক্তি অভাব-অনটনের সময় সুরা ইয়াসিন পাঠ করে তাহলে তার অভাব দূর হয়,
সংসারে শান্তি আসে এবং রিজিকে বরকত হয় ‘ (মাজহারি)
- হজরত আতা বিন আবি
রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন আমি শুনেছি যে, রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দিনের বেলায় সুরা
ইয়াসিন তেলাওয়াত করবে, তার সব হাজত (প্রয়োজন) পূর্ণ করা হবে।’ (দারেমি)
-হজরত
ইয়াহইয়া ইবনে কাসির রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে সুরা
ইয়াসিন পাঠ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুখে-স্বস্তিতে থাকবে। যে সন্ধ্যায় পাঠ
করবে সে সকাল পর্যন্ত শান্তিতে থাকবে।’ (মাজহারি)
মৃত্যুর যন্ত্রণা মুক্ত থাকার মাধ্যম সুরা ইয়াসিন
তাফসিরে
জালালাইনের হাশিয়ায় এসেছে, ‘যদি কোনো মুসলমানের মৃত্যুর সময় হয়, আর সে সময়
তার পাশে কেউ সুরা ইয়াসিন পাঠ করে, তবে বেহেশত থেকে রেদওয়ান ফেরেশতা
জান্নাতের সুসংবাদ না দেয়া পর্যন্ত রূহ কবজকারী ফেরেশতা (মালাকুল মাউত) ওই
ব্যক্তির রূহ কবজ করেন না। রূহ কবজের সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তি অবস্থান হয়
রাইয়্যান নামক জান্নাতে। হাদিসে পাকে এসেছে-
- হজরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু
আনহু বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে
শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘মৃত্যুশয্যা ব্যক্তির কাছে সুরা ইয়াসিন পাঠ করলে তার
মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হয়ে যায়। (মাজহারি)
- হযরত ইবনে ইয়াসার
রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেছেন, ‘এটা (সুরা ইয়াসিন) তোমাদের মুমূর্ষু (মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে)
ব্যক্তিদের কাছে পাঠ কর।’ (আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)
মুমিন মুসলমানের ঘরে ঘরে সুরা ইয়াসিনের নিয়মিত অধ্যয়ন, তেলাওয়াত ও আমল খুবই জরুরি। সুরাটি ‘সুরা ইয়াসিন’ নামে প্রসিদ্ধ হলেও এর রয়েছে আরও কয়েকটি নাম। যথাক্রমে তা হলো, ‘সুরা আজিমা’, ‘সুরা মুদাফিয়া’, ‘সুরা কাজিয়া’। এ ছাড়া আসমানি গ্রন্থ তাওরাতে এ সুরাটিকে ‘মুয়িম্মাহ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত প্রতিদিন সকালে অন্তত একবার এ সুরাটি তেলাওয়াত করা। কেননা এ সুরার তেলাওয়াতকারীকে ইহকাল ও পরকালে ব্যাপক কল্যাণ ও শান্তি দান করা হবে।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘এ সুরা কেয়ামতের দিন অধিক সংখ্যক মানুষের জন্য সুপারিশকারী হবে আর আল্লাহ তাআলা তা অবশ্যই কবুল করবেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের এ গুরুত্বপূর্ণ সুরাটির নিয়মিত তেলাওয়াত ও অধ্যয়ন করে সে আলোকে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের ফযিলত, অর্থসহ আরবি ও বাংলা উচ্চারণ ও পড়ার নিয়ম
বাংলা উচ্চারণ: হু আল্লা হুল্লাজী লা(আ) ইলাহা ইল্লা হু। আলিমুল গাইবী ওয়াশ শাহাদাতী হুয়ার রাহমানুর রাহীম। হু আল্লা হুল্লাজী লা(আ) ইলাহা ইল্লা হু।আল মালিকুল কুদ্দুসুস সালামুল ম্যু মিনুল মুহাইমিনুল আজিজুল জাব্বারুল মুতাকাব্বির। ছুব হানাল্লাহী আম্মা ইউশরিকুন। হু আল্লাহুল খালেকুল বারিয়্যুল মুছাওরেলাহুল আছমা(আ)উল হুছনা।ইউ ছাব্বিহু লাহু মা ফিছ ছামা ওয়াতি ওয়াল আরদ্ ওয়া হুয়াল আজীজুল হাকীম।
আয়াতুল কুরসীর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফযলিত
আরবি:
اللّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيم
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্কাইয়্যুম।লা তা’খুজুহু সিনাত্যু ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিসসামা ওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্। মান যাল্লাযী ইয়াস ফায়ু ইনদাহু ইল্লা বি ইজনিহি, ইয়া লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউ হিতুনা বিশাই ইম্ মিন ইল্ মিহি ইল্লা বিমা শা'আ,ওয়াসিয়া কুরসি ইউহুস সামা ওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়া উদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলিয়্যূল আজীম।
বাংলা অর্থ: আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তার। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তার কাছে তার অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তার জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তার কুরসি (সিংহাসন) সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তার পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।
ফযিলত: আবু জর জুনদুব ইবনে জানাদাহ (রা:) রাসূল (সা:)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনার প্রতি সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কোন আয়াতটি নাজিল হয়েছে? রাসূল (সা:) বলেছিলেন, আয়াতুল কুরসী। উবাই বিন কাব থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) উবাই বিন কাবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার কাছে কুরআন মজীদের কোন আয়াতটি সর্ব মহান? তিনি বলেছিলেন, (আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুআল্ হাইয়্যূল কাইয়্যূম) তারপর রাসূলুল্লাহ্ নিজ হাত দ্বারা তার বক্ষে (হালকা) আঘাত করে বলেন: আবুল মুনযির! তোমার জ্ঞান আনন্দদায়ক হোক।
উবাই ইবনে কা‘ব হতে বর্ণিত, তাঁর এক খেজুর রাখার থলি ছিল। সেটায় ক্রমশ তার খেজুর কমতে থাকত। একরাতে সে পাহারা দেয়। হঠাৎ যুবকের মত এক জন্তু দেখা গেলে, তিনি তাকে সালাম দেন। সে সালামের উত্তর দেয় । তিনি বলেন: তুমি কি ? জিন না মানুষ? সে বলে: জিন। উবাই তার হাত দেখতে চান। সে তার হাত দেয়। তার হাত ছিল কুকুরের হাতের মত আর চুল ছিল কুকুরের চুলের মত। তিনি বলেন: এটা জিনের সুরত। সে (জন্তু) বলে: জিন সম্প্রদায়ের মধ্যে আমি সবচেয়ে সাহসী। তিনি বলেন: তোমার আসার কারণ কি? সে বলে: আমরা শুনেছি আপনি সাদকা পছন্দ করেন, তাই কিছু সাদকার খাদ্যসামগ্রী নিতে এসেছি। সাহাবী বলেন: তোমাদের থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? সে বলে: সূরা বাকারার এই আয়াতটি (আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাহ হুআল হাইয়্যূল কাইয়্যূম), যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এটি পড়বে, সকাল পর্যন্ত আমাদের থেকে পরিত্রাণ পাবে। আর যে ব্যক্তি সকালে এটি পড়বে, সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের থেকে নিরাপদে থাকবে। সকাল হলে তিনি রাসূলুল্লাহ্র কাছে আসেন এবং ঘটনার খবর দেন। রাসূলুল্লাহ্ বলেন: খবীস সত্য বলেছে” ( সহীহুত্ তারগীব:১/৪১৮)
আবু উমামা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেছেন:
| যে ব্যক্তি প্রতি ফরয নামায শেষে আয়াতুল কুরসী পড়ে, তার জান্নাতে প্রবেশ করতে মৃত্যু ছাড়া কোনো কিছু বাধা হবে না। |
সুরা তওবার শেষ ২টি আয়াত ও তার ফযিলত
ফযিলত:- কাফেররা ইসলামের সত্যতা এবং রাসুল (স:) এর মোজেযা দেখেও তার সাথে বিভিন্ন ধরনের কটুতর্কে লিপ্ত হতো। তাদের এহেন দৃষ্টতা পূর্বআচরনের উত্তরস্বরূপ আয়াত দুুটি নাযিল করে। আল্লাহ বলেছেন যে, তোমরা অন্যায়ভাবে তাকে অপমান অত্যাচারে জর্জরিত করছো। অথচ তারপরেও তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য দোয়া করে থাকেন। কারন তিনি সত্য নবী। রাসূল (স:) এর দোয়া এবং আল্লাহর সাহায্য ও তার প্রতি নির্ভরতার বর্ণনা থাকায় আয়াত দুইটির আমলে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা লাভ হয়। নিয়মিত পাঠে স্বপ্নে রাসূল (স:) এর যিয়ারত লাত হয়।
প্রত্যেক নামাজের পর আয়াত দুইটি পড়লে রোজ হাশরে রাসূল (স:) এর শাফায়াত লাভ হইবে।
হাদিসে আছে ফরজ নামাজের পরে আয়াত দুইটি ৭ বার পড়লে দুর্বল থাকলে বলবান হবে, লাঞ্চিত থাকলে সম্মানিত হবে, দরিদ্র থাকলে ধনবান হবে, বিপদগ্রস্থ থাকলে বিপদমুক্ত হবে, অপমৃত্যু হবে না, আয়ু বৃদ্ধি পাবে, সকল কাজ সহজ সাধ্য হবে, পীড়িত অবস্থায় পরলে আরোগ্য লাভ করবে।
উচ্চারণ : লাক্বাদ ঝা-আকুম রাসু-লুম মিন আনফুসিকুম আযিযুন আলাইহি মা-
আনিত্তুম হারিছুন আলাইকুম বিলমু’মিনি-না রাউ’-ফুর রাহি-ম। ফা ইং তাওয়াল্লাও
ফাক্বুল হাসবিয়াল্লা-হু লা- ইলা-হা ইল্লা- হুয়া আলাইহি তাওয়াক্কাল্তু
ওয়া হুয়া রাব্বুল আ’রশিল আজি-মি। (সুরা তওবা : আয়াত ১২৮-১২৯ )
সুরা বাকারার শেষ দুইটি আয়াত ও তার ফযিলত
ফযিলত:- সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের ফজিলত প্রসঙ্গে নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে এ দুটি আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য এটাই যথেষ্ট।’
আল্লাহ তায়ালা রাসুল্লুলাহ (স:) -কে দুইটি আলোর ভান্ডার দান করেছেন, একটি হলো সুরা ফাতিহা এবং অন্যটি হলো সুরা বাকারার শেষ দুইটি আয়াত। রাসূল (স:) বলেছেন সমস্ত কোর আনের শোভা সুরা বাকারা । আর এই সুরার শোভা হলো এর শেষ দুইটি আয়াত। (মেশকাত শরীফ)
আয়াত দুইটি যারা প্রতিদিন পড়বে তারা আল্লাহর কাছে যা চাইবে তাই পাইবে। রাতে পড়লে হেফাযত থাকবে।
আবু মাসউদ (রা:) বলেন, রাসূল (স:) ফরমান , যে ব্যক্তি সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত রাতে পড়বে তার জন্য তা যথেষ্ঠ হবে।
জুবাইর ইবনু নুফাইর (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুরা আল-বাকারাকে আল্লাহ তাআলা এমন দুটি আয়াত দ্বারা শেষ করেছেন, যা আমাকে আল্লাহর আরশের নিচের ভান্ডার থেকে দান করা হয়েছে। তাই তোমরা এ আয়াতগুলো শিখবে। তোমাদের স্ত্রীদেরও শেখাবে। কারণ এ আয়াতগুলো হচ্ছে রহমত, (আল্লাহর) নৈকট্য লাভের উপায় ও (দীন দুনিয়ার সকল) কল্যাণলাভের দোয়া।’ [মিশকাতুল মাসাবিহ: ২১৭৩]
বদরি সাহাবি আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুরা বাকারার শেষে এমন দুটি আয়াত রয়েছে, যে ব্যক্তি রাতের বেলা আয়াত দুটি তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এ আয়াত দুটোই যথেষ্ট। অর্থাৎ রাতে কোরআন মজিদ তিলাওয়াত করার যে হক রয়েছে, কমপক্ষে সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত তিলাওয়াত করলে তার জন্য তা যথেষ্ট।’ [সহিহ্ বুখারি: ৪০০৮]
আয়াত দুইটি হলো:- আমানার রাসুলু বিমা উনঝিলা ইলাইহি মিররাব্বিহি ওয়াল মুমিনুন। কুল্লুন আমানা
বিল্লাহি ওয়া মালা ইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি লা নুফাররিকু বাইনা
আহাদিম মির রুসুলিহি। ওয়া কালু সামিনা ওয়া আতানা গুফরানাকা রাব্বানা ওয়া
ইলাইকাল মাসির। লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উসআহা–লাহা মা কাসাবাত
ওয়া আলাইহা মাকতাসাবাত–রাব্বানা লা তুআখিজনা ইননাসিনা আও আখতানা–রাব্বানা
ওয়া লা তাহমিল আলাইনা ইসরান কামা হামালতাহু আলাল্লাজিনা মিন ক্বাবলিনা–
রাব্বানা ওয়া লা তুহাম্মিলনা মালা তওয়া কাতা লানা বিহি–ওয়াফু আন্না
ওয়াগফিরলানা ওয়ারহামনা– আংতা মাওলানা ফানসুরনা আলাল কাওমিল কাফিরিন।’ (সুরা
বাকারা: আয়াত ২৮৫-২৮৬)